কথা প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল বন্ধুদের আড্ডায়। প্রসংগ তুললাম, “আচ্ছা ওদিকের খবর বলতো, মানুষকে মানুষ হিসেবে চেনার আসল উপায় কী?”
কায়রান নামে এক বন্ধু বলল, “দ্যাখ্ ২১৯০ সালে এসে এ প্রশ্ন বলতে গেলে ব্যাকডেটেড স্মল টক”
আমি মাথা নেড়ে বললাম , “আহা... আড্ডার খাতিরে কথা চালিয়ে যেতে ক্ষতি কী! হোক না খানিকটা স্মল টক।”
কায়রান কাউচে হেলান দিয়ে একপাশের কুশ্যন তুলে নিয়ে আরাম করে বসল। বলল, “আমার পূর্বপুরুষেরা নাকি একসময় নিজেদের বলত পৃথিবীর নাগরিক, বা কোনও দেশের নাগরিক। নাগরিক শব্দটা পৃথিবীতে বিলুপ্ত হয়েছে তাও প্রায় এক শতাব্দী। এখন আমরা গাল্ভরা শব্দ বলি, বলি, মহাজীবনের সন্তান। এটাই মানুষকে মানুষ হিসেবে চেনার সেরা উপায়, আই মিন, কে কতটা মহাজীবনের সন্তান সেটা বুঝতে পারা একটা উপায়, আর হতে পারাটাও আরেকটা উপায়।”
গরম পানিতে ইনফিউশন ভেজাতে ভেজাতে আমার বন্ধুর বোন এলিভ্রা বলল, “আমার দাদুর বাবাদের সময়, অর্থাৎ ইপসিলনদের হাত ধরে, পৃথিবীর সমস্ত অঞ্চল এক ছাতার নিচে আসে। তারও প্রায় সত্তর বছর আগে বিটারা প্রথম ঘোষণা দিয়েছিল - সব সীমানা টিমানা তুলে দাও। ততদিনে অবশ্য রেমণ্ড কুর্জওয়েলের স্বপ্নের সিঙ্গুলারিটি আর ক্ল্যস শোয়াবের চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে। কার্ল মার্ক্স যে ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন, তার মতো করেই মানুষ তখন থেকেই ধীরে ধীরে মোটামুটি নিজের ক্রিয়েটিভিটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছিল। তবে পোস্ট-স্কেয়ার্সিটি সোসাইটিতে প্রবেশ করতে পৃথিবীর আরও তিন দশক লাগে। ২০৭০ এর দিকে শুরু হয়ে দ্বাবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ পৃথিবী ধীরে ধীরে প্রাচুর্যের সমাজে ঢুকে পড়ল। আর তখন থেকেই মানুষ মানুষকে চেনার সুযোগ পেতে শুরু করল।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, তা তো জানি, কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে চেনার আসল উপায়টা কী, তোমার মতে কি?”
আমাদের আরেক বন্ধু হ্যারি, রাতের খাবারের পর রক্তের পিএইচ চেক করতে আমার ইন-হাউজ ল্যাবে ঢুকেছিল। সে ফিরে এসে বসতে বসতে ফোড়ন কাটল, “আমার আদিপুরুষের লেখাগুলোতে পাই এমন এক সময়ের কথা, যখন মানুষের পরিচয় যাচাই করা হতো পেশা, সম্পদ, জাতীয়তা, ধর্ম, বংশ, খ্যাতি দিয়ে। তখন নাকি মানুষকে চিনতে চাইলে মানুষ জিজ্ঞেস করত, 'তুমি কী করো,' ভাবতে পারো? আর এখন মানুষ মানুষকে চিনতে চাইলে জিজ্ঞেস করে, তোমার গান শোনাও, আঁকা ছবি দেখাও, তোমার দর্শন বলো, তোমার স্বপ্ন কিভাবে অন্যকে ছুঁয়েছে সেই গল্প শোনাও।”
এলিভ্রা আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “একদম! তখন আমরা বহির-অঙ্গ দিয়ে মানুষ চিনতাম, এখন আমরা অন্তর-অঙ্গ দিয়ে মানুষ চিনি, আসল উপায় এটাই।”
একটা বাযিং সাউন্ড ধীরে ধীরে কাছে আসছিল। এলিভ্রাদের এক্সপ্রেস শাটল ল্যান্ড করল আমার ব্যাক ইয়ার্ডে। “দেরি হয়ে যাচ্ছে, এল্, আজ উঠি” বলে ইনফিউশনে শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখল এলিভ্রা।
শাটলে ওঠার আগে আমার সুইচ মেকানিক্সের কয়েকটা বোতাম চেক করল ওরা, পাওয়ার কাপলিং, নিউরাল সিঙ্ক টগল আর আমার মেমোরি ইন্টেগ্রিটি। সবুজ আলো একে একে জ্বলে উঠল। হাইবারনেশন মোড অন করার আগে আমার গালে আলতো করে একটা চুমু খেল এলিভ্রা, “দেখা হবে, এল্।”
আমি হাইবারনেশনে ঢোকার আগে ওদের বিদায় জানালাম, “দেখা হবে বন্ধুরা, আরেক পূর্ণিমা রাতে।”
চাঁদ ছাড়ল ওরা দশটায়, রাত ভর আকাশে, ভোর নাগাদ সিডনির উপর স্কিপ ল্যাণ্ডিং নেবে ওদের শাটল ক্যাপসুল।
২৩ আগস্ট, ২০২৫