পেইন্টিং:
"অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই,
শুনি মানবের তুলনা কিছুই নাই"
ক্যানভাসে অ্যাক্রাইলিক, ২০ নভেম্বর ২০২২
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
পেইন্টিং:
"অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই,
শুনি মানবের তুলনা কিছুই নাই"
ক্যানভাসে অ্যাক্রাইলিক, ২০ নভেম্বর ২০২২
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
মানুষ নামের প্রাণীটি ভঙ্গুরতার দিক থেকে অনন্য। শরীরিকভাবে যদি নাও হয়, অন্তত মানসিকভাবে মানুষ প্রকৃতির সবচেয়ে নাজুক প্রাণী। এই ভঙ্গুরতাই তাকে আলাদা করেছে প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর থেকে। মানুষের এই ভঙ্গুর মানসিকতা তাকে নিরন্তর আতঙ্কিত রাখে, বিশেষ করে তিনটি মূল ভয়ে।
প্রথম ভয় - একা হয়ে যাওয়া। একা হয়ে গেলে কি সমস্যা, এর কন্সিকোয়েন্স কি? আমার মতে মানুষের চালিকাশক্তির মূল উপাদান হলো কনভেনিয়েন্স মতান্তরে কম্ফোর্ট এর খোঁজ করা। আমি যখন গুহায় ছিলাম, তখন আমি ঠান্ডায় কষ্ট পেতাম, কাঁচা মাংস হজম করতে পারতাম না, তাই আগুন বানালাম। একখান থেকে আরেকখানে যাওয়া ঝামেলা মনে হতো, আমার কষ্ট হতো জিনিস বয়ে নিয়ে যেতে, তাই আমি চাকা বানালাম। আজকের সভ্যতার নিত্য নতুন আবিষ্কার বলতে গেলে সবই কনভেনিয়েন্স মতান্তরে কম্ফোর্ট এর জন্য। আর তাই, সেই প্রথম ভয় অর্থাৎ একা হয়ে যাবার কন্সিকোয়েন্সও হলো ইনকনভেনিয়েন্স তথা ডিসকম্ফোর্ট।
মানুষের দ্বিতীয় ভয় হলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার ভয়। কিন্তু কেন? প্রতিটি মানুষতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে একদিন। যদিও সবাই জানে যে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তবুও ইগো মেনে নিতে পারে না। প্রতিটি মানুষ মুছে যাবে সেও মূছে যাবে, সমস্যা কোথায়? কিন্তু না, যেহেতু কিছু মানুষ কালের পাতা থেকে মোছে না, এইখানেই সমস্যা। মানুষ তখন ভাবে- আমি শেষ হয়ে যাব, কিন্তু কারও কারও চিহ্ন থাকবে, কেউ কেউ অমর হয়ে থাকবে, তা কেন হবে। এইটাই সমস্যা। নয়তো মৃত্যুর পরে মানুষ নেই, সুতরাং তার ভয়ও থাকার কথা না, তার চিহ্ন থাকলো কি থাকলো না তাতে তার কিছু যায় আসার কথা না। আসলে মানুষের অস্তিত্বসচেতনতা (ইগো) মেনে নিতে পারে না অন্যের চিহ্ন থাকা আর নিজের মুছে যাওয়া। মনোজাগতিক দিক থেকে এটা মেনে নেওয়াটাই তার জন্য ইনকনভেনিয়েণ্ট। তাই মানুষ ভিজিব্ল হতে চায়- চিহ্ন রাখতে হবে। আর যদি কষ্টেসৃষ্টে পারে তো সৃষ্টির মাধ্যমে অমর হতে চায়।
মানুষের সবচেয়ে বাস্তব ভয় হলো প্রিয়জন হারানোর ভয়। প্রথম বা দ্বিতীয় কোনটাই না এটা। এটা মানুষের সবচেয়ে দৃশ্যমান (মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ফিজিক্যাল অ্যাবসেন্স কেন্দ্রিক) ইনকনভেনিয়েন্স/ ডিসকম্ফোর্ট।
এই তিনে, মানুষ এক ভীতিপ্রবণ প্রাণী। কিন্তু প্যারাডক্সিক্যালি এই ভয় কয়টি মানুষকে সামনের দিকে ধাক্কে দেয়, চিন্তা করতে শেখায়, শিল্প তৈরি করতে শেখায়, অজানা জ্ঞান খুঁজতে শেখায়। মানুষের যদি এই ইনকনভেনিয়েন্স/ ডিসকম্ফোর্ট এর মৌলিক ভয়কটি না থাকতো, তাহলে হয়তো সে আর যেকোনো প্রজাতি হিসেবেই থেকে যেত এ ধরিত্রির বুকে; তার কোনো ইতিহাস থাকত না, তার কোনো সভ্যতা গড়ে উঠত না।
হারানোর ভয়ে, ভূলুণ্ঠিত হওয়ার ভয়ে মানুষ উপাসনালয় গড়ে, বই লেখে, গ্রহ-উপগ্রহে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, গান বাঁধে, ছবি আঁকে, কবিতা লেখে, আকাশের দিকে মুখ তুলে দু হাত বাড়িয়ে দেয়।
[বি:দ্র এই লেখাটি কোনো চূড়ান্ত সত্য বা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নহে। ইহা কেবল লেখকের ব্যক্তিগত চিন্তাধারা ও ব্যাখ্যার নিবেদনমাত্র। পাঠকগণকে বিনীত নিবেদন এই যে লেখাটিকে তর্কযোগ্য ‘চূড়ান্ত সত্য’ হিসেবে না পড়িয়া দার্শনিক/সাহিত্যিক প্রতিফলন হিসেবে পড়িতে]