আমরা চার বোন। আমাদের কোনও ভাই নাই। ভাই না থাকার কারণে পদে পদে আমার বাবা মা কে শুনতে হয়েছে এখনও হয়, ইস একটা ছেলে যদি থাকত আপনাদের আজকে। ছোটবেলা থেকেই যদু মদুর মুখে শুনে এসেছি, শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, "ইস ভাই নাই... "আহারে ভাই নাই" ইত্যাদি। আমাদের বাবা মার হৃদয়ের গহীনে পুত্র সন্তান না থাকার ব্যাথা আদতে কতটা তাঁদের নিজেদের আর কতোটা সমাজের আরোপিত, তা একটা সাবঅপ্টিম্যাল সিস্টেমে চরে বেড়ানো মানুষ এক সময় আর আলাদাকরে বুঝতে পারে না। ওখানে আপনি ফ্রিকোয়েন্ট ভলান্টিয়ার পাবেনই যারা আপনাকে সময়ে সময়ে মনে করিয়ে দেবেই পুত্র সন্তান না থাকায় আপনার জীবন ব্যর্থ, আপনি অপূর্ণ, আপনার পরিবার একটা লো-রেজুলিউশন পরিবার।
এই মহামূল্যবান সার্ভিসটা দেশের সমাজ ফ্রি ফ্রিই দেয়। শুধু আপনার জীবনে একটু শান্তি ঢুকতে দেখলেই সমাজ এসে রিমাইন্ডার দেয়। কারণ শান্তি সন্দেহজনক বস্তু, আপনি শান্তিতে থাকলে সমাজের কপালে ভাঁজ পড়ে।
আমাদের বাবা বরাবর অল্প কথা বলা মানুষ। তার সবচেয়ে বড় শক্তিটা কোথায় জানেন? সে বাস্তবতাকে সরাসরি নেয় না, একটু রিফ্রেম করে নেয়। যেমন ধরেন কেউ বলল, "আহারে আয়নাল, আহা ভাই, মেয়েগুলাকে এত পড়াশুনা করায় কি হইল, একটা মেয়েও তো কাছে নাই..." এই কথা আমাদের বাবার খুব ফানি মনে হবে, সে পরে বাসায় রসায়ে রসায়ে সেটা নিয়ে গল্প করবে আর ব্যাপারটা খুবই ফানি এটা ভেবে নিজের রসিকতায় নিজেই হাসবে। এখানে আমার বাবার একটা গোপন দর্শন আছে, যদিও সে সেটা দর্শন বলে মানে কিনা আমি জানি না। সে মনে করেন, মানুষ যা বলে সেটাই সত্য না, মানুষ যা বলে, সেটা অনেক সময় তাদের নিজের ভেতরের ভাঙাচোরা কাঠামো থেকে বের হয়ে আসা কথা। সেইসব কথার সবটাই সিরিয়াসলি নিলে চলে না, সে হাসতে হাসতে বলে, "ধু-র ওই কি কইলো আর মোর কি হইলো..."
বছর খানের আগে একজন বিজ্ঞ ডাক্তার তার বুকে স্টেথো বিলোতে বিলোতে বলল,"ছেলে মেয়ে কয়জন?"
তারপর আলোচনা এগোল এভাবে:
-"চাইরটা মেয়ে, ছেলে নাই"
-"অ্যা চাইর মেয়ে, বিয়া সাদি হইছে?"
-"হ্যাঁ বিয়া হইছে সবার। পড়াশুনা শেষ, যার যার মতো করে খাচ্ছে"
-"কই থাকে মেয়েরা?"
-"থাকে সব দেশের বাইরে। একেকজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী..."
(এখানে বলাই বাহুল্য এই স্টেট্মেন্ট দেওয়ার সময় আমার বাপ-মায়ের গুজবাম্প হয়।)
এই গুজবাম্পটা শুধু গর্বের না, এটা আসলে আয়নাল-রাহেলা দম্পতির একটা যুগ্ম পুরনো ব্যাথাকে মলম দিয়ে ঢেকে রাখার মতো। বাইরে থেকে কেউ তাঁদের সেই ব্যাথায় খোঁচা দিলে ওরা ভেতরে ভেতরে বলে- আমরা আমাদের ব্যাথা নিয়ে শুধু হাঁটতেই না, দৌড়াতেও শিখেছি।
যদি আমার বাপ-মা আলোচনায় এই পর্যায় পর্যন্ত আসতে পারে, তখন তারা কিছু ডিটেইলস যোগ করতে থাকে, অনেকটা আইসক্রিমের উপরের কালারফুল স্প্রিঙ্ক্ল ছিটানোর মতো করে তারা বলে, "চারজনের মধ্যে তিনজনই পিএইচডি, যে মেয়েটা পিএইচডি করেনাই, সেও কিন্তু কম না, সে কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে মাস্টার্সে গোল্ড মেডেল পাইসিল..." ইত্যাদি।
তারপর আলোচনা আর তেমন একটা আগায় না। বকাউল্লার যা বকার ছিল বকে ফেলেছে, শোনাউল্লাহর যা শোনার ছিল শুনে ফেলেছে।
তবে অনেক সময়ই এই ধাপেই আসে রিয়েলিটি চেক; শোনাউল্লাহ বলে, "যত যাই হোক এই বয়সে মেয়েরা পাশে নাই অসুখ বিসুখ হইলে কে দেখবে।" তারপর আসে সেই অমোঘ উদ্বিগ্ন বাণী "খাটিয়া ধরবে কে?"
আমার মা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়। আর আমার বাপের কাছে খাটিয়া ধরার মানুষের অভাবটাও খুব ফানি মনে হয়। সে বাসায় ফিরে হাসতে হাসতে বলে, "ধু-র, ওই কি কইলো আর মোর কি হইলো..."
তবে ইদানিংকালে আমার মায়ের বুদ্ধি খুলেছে; কেউ খাটিয়া প্রসঙ্গের অবতারণা করলে আমার মা উত্তর দেয়, "কোনওদিন কি শুনছেন, খাটিয়া ধরার অভাবে কারও কবর হয়নাই, আজব কথাবার্তা বলেন।"
লেখার এই পর্যায়ে আমি এবার একটু অন্যদিকে যাব; সেটা হলো- আপনি যেই হন, জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে আপনি অনেক কিছু চিনতে শিখবেন, বয়সের সাথে সাথে আপনার একটা উইজডোম লেয়ার আফটার লেয়ার বাড়তে থাকবে, সেটা হলো মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের বৈচিত্র্য। এই বিশ্বপ্রকৃতি আপনাকে অবাক করবে, অদ্ভুত ভাবে আপনার সামনে থেকে অনেক ভেইল সরে সরে যাবে। আপনি খুব অবাক হয়ে খেয়াল করবেন যাদের সাথে আপনার পনের বিশ বছর আগে গলায় গলায় খাতির ছিল, তারা সরে গেছে অনেক দূরে, যাদের আপনি পনের বছর আগে অ্যাাভয়েড করতেন তারা কেমন যেন আপনার সোলগ্রুপের অর্বিটের ঢুকে পড়েছে, যাদের আপনি শিশুকালে জীবনের মেইন ক্যারেক্টার ভেবেছিলেন, তারা হঠাৎ সাইড ক্যারেক্টার হয়ে গেছে; আবার যাকে আপনি বিশ বছর আগে সাইড ক্যারেক্টার ভাবতেন, সে একদিন আপনার জীবনের নীরব ন্যারেটর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; আবার কিছু সম্পর্ক সুপার লেইট বাসের মতো দেখবেন, মানে সে বাস এতই লেইট হবে যে আপনি যখন হামাগুড়ি দিতেন তখন বাসস্টপে ওয়েট করতে গেছেন, বাস যখন আসবে ততদিনে আপনি হাঁটা কেন দৌড়ানোও শিখে গেছেন। এভাবে সময়ের পরতে পরতে আপনি আবিষ্কার করবেন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো কেমন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে, আর বদলটা কখনও ড্রামাটিক্যালি হবে না, হবে খুব ধীরে ধীরে, খুবই সাট্ল সিফ্ট এইসব জিনিস।
ভাই না থাকার প্রসঙ্গে, মানে আমার বাবা-মায়ের পুত্র সন্তান না থাকার ব্যথার বিষয়ে কথা হচ্ছিল। অন্য দিকে আমাদের চার বোনেরই এ ব্যাপারে একটা ইনস্টিংক্ট ছিল; সেটা হলো, আমাদের যদি ভাই থাকত, সে ভাই বখাটে হতো মাস্তান হতো অপদার্থ হতো স্বার্থপর হতো, এবং একটা বখাটে অপদার্থ স্বার্থপর ছেলে যে আমাদের ভাই হিসেবে অবতীর্ণ হয়নাই এইটা একটা মিরাকল ভেবে আমরা শুকরিয়া আদায় করতাম।
তো ভাই হতে হলে যে সব অ্যাট্রিবিউট থাকা দরকার তা একজন ভাইয়ের মধ্যে আল্টিমেইটলি হয়তো থাকে না, এরকম একটা অদ্ভুত ধারনা আমরা পোষন করতাম। যেমন কেয়ারিং? প্রকৃতপক্ষে একটা ভাইকে কেয়ারিং হতেই হয় আর যাই হোক, এবং আমাদের যদি ভাই থাকত, সে একসময় না এক সময় ক্লান্ত হয়ে যেত, জীবনের নানা কমিট্মেন্টে আমাদের প্রতি তার কেয়ারিং মেণ্টালিটিতে সে ক্ষান্ত দিত, মানে দিতই। তখন আমরা খুবই মর্মাহত হতাম; ভাইয়ের সেই রুপটা আমরা দেখতে চাইনি কখনও, তাই আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তা ভাই না দিয়ে আমাদের উপর এক রকম রহমত বর্ষণ করেছেন, এটা ভেবে আমরা একরকম শান্তি অনুভব করতাম।
এটার একটা ব্যাখ্যা এখন আমি বুঝি। মানে, কেন আমরা ভাই না থাকাতে শান্তি অনুভব করতাম- বড় হওয়ার পর রেট্রোস্পেক্টিভ সেলফ-রিফ্লেকশনে সেটার কারণ ধরতে পেরেছি। আসলে ওটা ছিল সারভাইভালের লোকাল ইন্টেলিজেন্স। চার মেয়ে-ওয়ালা একটা বাড়িতে একটা সমাজ ঢুকে বারবার একই প্রশ্ন করে গেছে, "ভাই কই, তোমাদের ভাই কই?" আর সেই প্রশ্নের ধারাবাহিকতায় আমরা ছোটবেলা থেকেই আমাদের "না-জন্মানো ভাই"কে বখাটে মনে করে একটা নিঃশব্দ কাউন্টার-থিওরি বানিয়ে ফেলেছিলাম, ওটা ছিল আসলে আমাদের মানসিক ইমিউনিটি। আমাদের চারবোনের চোখে একই দৃশ্য বারবার রিপ্লে হয়েছে: সমাজ আমাদের না-জন্মানো ভাইকে "আশীর্বাদ" বানিয়েছে, আর সেই "আশীর্বাদ" যেহেতু আমাদের পরিবারে আসেনি তাঁর মানে বিষয়টা একটা "ডেফিসিট"।
কিন্তু "প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না।"
এবারে শোনেন, আপনাদের বলি এক আশ্চর্য কথা। এমন কথা আপনারা কস্মিঙ্কালেও শুনেছেন কিনা জানিনা। ফ্যান্টাসি ভাইয়ের সব গুনাবলি নিয়ে গত দশ বছর আগে আমাদের পরিবারে আগমন ঘটেছে এমন একজন মানুষের, মনে করেন তাঁর নাম - হামিদ খান। তাঁকে আপনারা দেখতে পাবেন- আমাদের পরিবারের সাথে রিলেটেড উল্লেখযোগ্য সকল স্থানে। মানে, মনে করেন, আমাদের কারও বিয়া লাগছে, সেখানে তাঁকে তদারকি করতে দেখবেন। আমাদের কেউ বিদেশ থেকে আসবে? এয়ারপোর্টে পিক-আপ করতে তাঁকে দেখবেন, ক্লান্ত দেহমন জুড়াতে তার বাসায় নাইট-হল্ট করতে হবে; ব্রেড-ব্রেকফাস্ট-লাঞ্চ প্যাকেজ রেডি থাকবে, তাঁর ড্রাইভার জিয়াভাই রেডি থাকবে, তার রুপার মা রেডি থাকবে, আপনার কি লাগবে বলেন।
অসুস্থ রোগীর সাথে হাসপাতালে আমাদের পরিবারের পাশে তাঁকে পাবেন, জন্মদিনের অনুষ্ঠান, মুসলমানি, মৃতবাড়ি সকল স্থানে তাঁকে পাবেন আমাদের পাশে, আমাদের দেশেরবাড়িগুলোতে, আমাদের শশুরবাড়িগুলোতে তাঁর বাহন আর জিয়া ভাইকে নিয়ে সে উপস্থিত হবে বিভিন্ন অকেশনে, পালা-পার্বণে; আমাদের দূর্দিনে তাঁকে পাবেন, আমাদের সু-দিনে তাঁকে পাবেন, আমাদেরকে না পেলেও আপনি তাঁকে পাবেন আমাদের বাবা-মার পাশে। সে কে জানেন? ওইযে আমাদের এক বোনের কথা বললাম না, রাষ্ট্রপতির হাত থেকে গোল্ড মেডেল পাওয়া, সেই বোনের শশুর সে, মনে করেন তাঁর নাম - হামিদ খান।
আমি মিরাক্যুলাস ব্যাপারগুলো লুকিয়ে রাখায় বিশ্বাসী। কিন্তু দশ দশটা বছর। একটা মানুষ আমাদের ভাইয়ের ভূমিকাগুলো অম্লান বদনে পালন করে আসছে, কোনও ক্লান্তি নেই, সেই মানুষটার ব্যাপারে অনেকবারই লিখতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নিয়েছি। কারণ কিছু কিছু বিষয় বিয়ন্ড কম্প্রিহেনশন।
আমার মা তাই একটা বিষয় বোঝে আজ, যদি সমাজের দরবারে "ভাই" নামের একটা চরিত্র সত্যিই দরকার হয়, তবে "রক্তের" সম্পর্কের "ভাই" না হয়েও "উপস্থিতির" সম্পর্কে "ভাই"য়ের চেয়েও বেশি কিছু হওয়া যায়। কারণ, "প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না।"
আমাদের যদি একটা ভাই সত্যিই থাকতো, তাকেও হয়তো আমরা পরিবারের জন্ম, মৃত্যু, সি- অফ, পিক-আপ, মুসলমানি, ফ্যামিলি গ্যাদারিং সর্বাবস্থায় পেতাম না; আমাদের এই ভাই-সদৃশ তাওয়াই কে আমরা যতোটা পাই।