ব্যক্তিমানুষ ও সৃষ্টিমানুষ
যারা লেখালেখি বা সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত, তারা হয়তো অনুভব করেন, এ পথের যাত্রাটা অনেকটাই নিঃসঙ্গ। এই নিঃসঙ্গতার একটা বড় কারণ হিসেবে আপনার মনে হতে পারে- মানুষ আপনাকে প্রায়ই ব্যক্তিমানুষ হিসেবে চেনে, কিন্তু সৃষ্টিমানুষ হিসেবে চিনে ওঠে না।
যেমন ধরেন আপনি যদি লেখালেখি করেন, আপনি দেখবেন আপনার খুব কাছের মানুষেরা আপনার লেখা দেখে এখানে সেখানে, পড়ে, জানে, কিন্তু প্রকাশ্যে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে কখনোই তারা আপনার সৃজনশীল কাজের পোস্টে সামান্যতম উৎসাহ দেখাবে না (পোস্টের কথা বলছি কারণ আজকাল আমাদের লেখা, আঁকা, গান, কবিতা, ভাবনা, সবই কমবেশি সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট হয়েই প্রথমে মানুষের সামনে আসে)। যাইহোক, প্রকাশ্যে তারা আপনাকে কখনও অনুপ্রেরণা দেবে না। অথচ সেই মানুষরাই হয়তো নানা সময়ে কথাবার্তায় গোপনে আপনাকে বলবে আপনার অনেক প্রতিভা ইত্যাদি। আপনি হয়তো আপনার ক্ষেত্রে তাদের ইগনোরেন্স বলুন আর ডেলিবারেট উদাসীনতাই বলুন সেটা ভুলেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু ওই ধরনের প্রাইভেট প্রশংসামূলক মুহূর্তগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে বা দেয়। কারণ তখন আপনার মনে হয়- আমার যে অংশটা সবচেয়ে জীবন্ত, সবচেয়ে গভীর আর সত্য ছিল, সেই অংশটার সামনে এসেই যখন তোমরা প্রকাশ্যে চুপ হয়ে থাকো, তবে এখনও তাই থাকো না, সেই তো ভালো।
তবে একথাও আপনাকে বুঝতে হবে- আপনার কাছের মানুষরা আপনার সৃজনশীল সত্তাকে দেখতে পাবে না। এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাদের কাছে আপনি খুব দৈনন্দিন একটা মানুষ; বাজার করেন, রাগ করেন, ভুল করেন, অতি সাধারণ ভাবে মিশে থাকেন। আপনি বিস্ময়কর কিছু নন, এটাই তো স্বাভাবিক। আপনি যে ছোট আমি থেকে বড় আমিতে পরিণত হয়েছেন, গভীর হয়েছেন, গম্ভীর হয়েছেন, এই সত্যিটা তাদের মেন্টাল ল্যান্ডস্কেপে তেমনভাবে কখনও জায়গা পাবে না। তাই যদিও তারা আপনার সৃষ্টিশীল সত্তাটাকে অস্বীকার করে না, তারপরও আপনার আপনি হয়ে ওঠাকেও তারা স্বীকার করে না।
আবার আরও একটা ব্যাপার হলো আপনি যে একটু একটু করে আপনার নিঃসঙ্গ, অতি সত্য একটা সত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে "দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে(ন) ধীরে ধীরে", সেই যাত্রায় এ যাবতকালে তাদের অনেকেই আপনাকে অনুপ্রেরণা দেয়া থেকে খুবই মাইন্ডফুলি বিরত থেকেছে, তাই হঠাৎ আর তারা আপনার পাশে দাঁড়াতে চাইলেও, তাদের সেই পুরোনো নীরবতার দায় সামনে এসে দাঁড়ায়।
আবার এর পেছনে আরও একটা সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্নও আছে। মনে করেন, আপনি লেখেন, আঁকেন, গান করেন, নাচেন বা কোনও একটা ক্রিয়েটিভ কাজ করেন, তাহলে হয়তো পৃথিবীর এই অদ্ভুত নিয়মটা অলরেডি জানেন। সেটা হলো- মানুষ অনেক সময় আপনার সৃজনশীল সত্তাকে সহজে উৎসাহ দেবে না, কিন্তু সেই একই মানুষই হয়তো আপনার দুর্বলতায় সরব হয়ে উঠতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। যেমন ধরেন এখন তো সবই মোটামুটি সোশ্যাল মিডিয়ার রব ওঠানোর ব্যাপার- আপনি যদি বলেন আপনার পা মচকেছে, অপারেশন হবে, বা আপনি রেগে আছেন, কে বা কারা আপনার মনভঙ্গের কারণ ইত্যাদি, তখন মানুষ খুব দ্রুত সাড়া দেবে। কিন্তু আপনি যদি আপনার সৃজনশীল কোর বিইংটাকে জনসমক্ষে তুলে ধরেন, তখন সেই একই মানুষ চুপ হয়ে যাবে। কারণ কি জানেন? কারণ আপনি যখন দুর্বল, তখন আপনাকে সহানুভূতি দেখালে কাউকে কিছুই হারাতে হয় না, কেউ নিজের অবস্থান এক চুলও হারায় না। কিন্তু আপনি যখন বিকশিত, তখন আপনার সৃজনশীল উত্থানকে স্বীকার করা মানেই আপনার বিচ্ছুরিত আলোকে জায়গা করে দেয়া। আপনাকে স্বীকার করা মানেই নিজের ভেতরের অন্ধকার, অপূর্ণতা, না পারা, এইসবকিছুর মুখোমুখি দাঁড়ানো। এটা খুব কঠিন একটা কাজ।
আর এভাবেই আপনার একধরনের সামাজিক সংকোচ তৈরি হবে। মনের খুব গভীরে আপনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারবেন, মানুষ আপনার পতনের ভাষা পড়তে পারলেও, আপনার উত্থানের ভাষা পড়তে পারে না।
তখন দেখবেন সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত থাকার কারণে আপনার অনেক চেনা সার্কেলের সাথে দূরত্ব তৈরি হবে। কারণ তারা আপনাকে শুধু পরিচিত বেড়াজালে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। তাই আপনার ভেতরের গভীরতা, সৃজনশীলতার অস্থিরতা, ডিটারমিনেশন ইত্যাদি দেখতে পেয়ে তারা আপনার বৃদ্ধি টের পেতে শুরু করে, আপনার বৃদ্ধি টের পেতে শুরু করলেই তারা চুপ হয়ে যেতে থাকে। তারা যখন চুপ হতে থাকে, তখন আপনি আঘাত পান। আপনি হয়তো আবার খুব প্রমিনেন্টভাবেও আঘাত পান না, কারণ আপনি জানেন- তারা আপনাকে অপছন্দ করে না, তবে তারা শুধু বুঝতে পারে না, আপনার যে সত্তাকে তারা এতদিন অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিল, এবার সেটাকে খানিকটা মাপা মাপা জায়গা দেবে, নাকি আপনাকে তাদের মানসিক পরিসর থেকে নীরবে সরিয়ে রাখবে। কনফিউজড একটা অবস্থা। এভাবেই অনেকের সাথে আপনার দূরত্ব তৈরি হবে। এটা খুব ন্যাচারাল প্রসেস।
আবার অদ্ভুতভাবে, আপনার সৃজনশীল কাজের কারণেই দূরের মানুষ আপনার আত্মীয় হয়ে উঠবে। যাদের আপনি কখনও দেখেননি, যাদের সাথে আপনি কোনও রকমের পারিবারিক, সামাজিক বা নিকট সম্পর্কের বলয়ে যুক্ত নন, তারাই আপনার সৃষ্টিকর্মের যাত্রায় সবচেয়ে আপন নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী হয়ে উঠবে। আর আপনি যদি উদার মনের মানুষ হন তবে এইসব মানুষদের আপনি আপনার সৃষ্টিকর্মের সহস্রষ্টা ভাবতেই পারেন। তাই তাদেরকে কখনও অবজ্ঞা করবেন না। সংখ্যায় তারা হয়তো খুব বেশি হবে না, কিন্তু ওই কজন সত্যিকারের অনুভব করতে পারা দূরের মানুষ আপনার শত শত অমনোযোগী কাছের মানুষের চেয়েও মূল্যবান। কারণ তারা শুধু আপনার সৃজনশীল কাজটুকুই দেখে না, তারা আপনার কোর বিইংটাকে অনুভব করতে পারে। জগতে অনেক সময়ই সবচেয়ে সত্যিকারের আত্মিক নৈকট্য একই রক্তে বা একই জীবনের অভ্যস্ত পরিসরে জন্মায় না, সত্যিকারের আত্মিক নৈকট্যের জন্ম হয় একই মর্মবোধের ভেতর। কারণ শেষ পর্যন্ত, যে মানুষেরা আপনার ভেতরের মানুষটিকে চিনে নেয়, সেই মানুষেরাই আপনার পথের মানুষ। আর তাদের জন্যেই হয়তো আপনার লেখা আঁকা গান কবিতা কোনোদিনই
একেবারে
শূন্যে
বিলীন
হবে না।