একদা পলিম্যাথ জনাব আলবার্ট শোয়াইট্জার নাকি বলিয়াছিলেন, “কো-ইনসিডেন্স ইজ দ্য সিউডোনিম ডিয়ার গড চুজেস হোয়েন হি ওয়ান্টস টু রিমেইন ইনকগনিটো।” মানে, ঈশ্বর যখন নিজের পরিচয় গোপন রাখিতে চাহেন, তখন কাকতালীয় ছদ্মনামটি ব্যবহার করিয়া থাকেন।
কথাটি সত্য কি না, তাহা আলবার্ট শোয়াইট্জার ও ঈশ্বরই ভালো জানেন। এইখানে ধর্মতত্ত্ব স্থাপন করিবার কোনো অভিপ্রায় আমার নাই। যাহারা জগতের সকল ঘটনাকে যুক্তি, সম্ভাবনা ও পরিসংখ্যানের মারফত বুঝিতে পছন্দ করেন, তাহাদের সহিতও আমার কোনো বিবাদ নাই। আমি কেবল বলিতে চাই, মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন কিছু মিলিয়া যায়, যাহাকে কেবল হিসাবের খাতায় ধরিতে গেলে গল্পের মজা নষ্ট হয়। কেহ ইহাকে কাকতাল বলিবেন, কেহ বলিবেন দৈবযোগ, কেহ বা কপাল কুঁচকাইয়া বলিতে পারেন- মানুষের মস্তিষ্কই নাকি এলোমেলো ঘটনার ভিতরে ছক খুঁজিয়া বেড়াইতে পছন্দ করে। আমি আপাতত সেই তর্কে প্রবেশ করার চাইতে ঘটনার ভিতরের বিস্ময়টুকুতে অধিক আকর্ষণ বোধ করিতেছি। সেই কথাই বলিতে আসা।
নিয়তই এমন এমন ঘটনার কথা শুনিয়া থাকি, বা স্বীয় জীবনেও ঘটিয়া থাকে যে, তাহাকে গুরুত্ব না দিয়া উড়াইয়া দিতে গেলে অন্তর একটু আপত্তি করিয়া ওঠে। মনে হয়, কোথাও যেন অদৃশ্য এক কেরানি বসিয়া আছেন- তিনি মানুষের ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষা, স্নেহ, ভয়, ভুলোমন, এবং দৈনন্দিন জীবনের আপাত তুচ্ছ ঘটনাগুলি- সব একেকটি পাতায় লিখিয়া রাখেন। পরে সুবিধামতো সময়ে এক পাতার সহিত আর এক পাতা মিলাইয়া দেন, আর আমরা বিস্মিত হইয়া বলি, ইহা নিছকই কাকতাল। এইসব ঘটনার আসল আনন্দ বোধ করি ঘটনার মধ্যেই শেষ হয় না- তাহা কাহাকেও বলিতে পারিলে তবে পূর্ণতা পায়। কারণ মানুষ একা বিস্মিত হইতে পারে বটে, কিন্তু বিস্ময় ভাগ করিতে না পারিলে তাহার স্বাদ অর্ধেকই থাকে। অথচ আজকাল এমন এক সময় পড়িয়াছে, যেখানে কথা বলিবার মানুষ আছে বটে, কিন্তু মন দিয়া শুনিবার মানুষ দুর্লভ।
লোকে আজকাল কেমন জানি আপাত আপাত হইয়া গিয়াছে। কেহ কাহারও প্রতি সম্পূর্ণ অনাগ্রহী নহে, আবার মনোযোগীও নহে। এককালে লোকে চিঠি পড়িয়া কাঁদিত, উত্তর লিখিবার আগে দুই দিন ভাবিত। আর এখন লোকে এই বেলা অনলাইনে কাঁদিয়া ভাসায়, তো পরবেলা ইলিশ ভাজার ছবি দেয়। এই ঘণ্টায় প্রতিবাদ করিয়া শোকবার্তা দেয় তো পরের ঘণ্টায় সেলফি তুলিয়া রেস্তোরাঁর রিভিউ দেয়। লোকে এখন কেমন জানি দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুলিয়া থাকে। ফলে শহুরে হইহট্টগোলের আধুনিক জনপদের মানুষের ভিড়ে, কাহাকেও তেমন বুঝিতে পারি না। সকলেই যেন কোথায় হারাইয়া গেল। এহেন সময়ে মন মাঝে মাঝে কেমন করিয়া ওঠে। মনে হয়, এক কাপ চা হাতে লইয়া কাহারও বারান্দায় বসিয়া যদি বলা যাইত- জানো, আজ না একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল।
আমার বিদেশবিভুঁইয়ের জীবনে আশেপাশের কাহারও সহিত এই মর্মে কথাবার্তা তেমন আগায় না। লোকে অফিসের কাজ লইয়া ব্যস্ত, তাহার উপর সন্তান-সন্ততি, মর্টগেজ, সপ্তাহান্তের বাজার, এইটা ওইটা বিনোদন ইত্যাদি লাগিয়াই থাকে, অধিকাংশ লোকই পথিমধ্যে আমাকে থামাইয়া দিয়া নিজেদের কথা বলিতে আরম্ভ করিয়া দেয়। সুতরাং আপনাদের নিকটই দুটি কথা বলিতে আসা।
তবে কথা হইতেছে, অন্যায়, হেনস্তা, হানাহানি, আর নানাবিধ বিনোদনে যখন লোকে মাতিয়া আছে, তখন আমার নিকট হইতে দুটি ভালো কথা শুনিতে কি আপনাদের ইচ্ছা হইবে? যাহার হইবে, হইবে। যাহার হইবে না, হইবে না। জোর করিবার কিছু নাই।
তা ওই রংপুর শহরে কাচারি বাজারের দিকটিতে, যেখানে কোর্ট-কাচারির লোকজন, ফটোকপিয়ারের দোকান, ছোট ছোট হোটেল, দালাল, কেরানি, উকিল-মক্কেল, আর নানাপ্রকার ব্যস্ত মানুষের ভিড়ভাট্টা, সেইখান হইতে একটু পূর্ব দিকে তাকাইলে একটি আটতলা দালানের পাশে একটি পাঁচতলা দালান দেখিবেন। সেইখানে বাস করেন আয়নাল আবেদীন এবং তাঁহার সংসার-পারঙ্গমী স্ত্রী লায়লা বেগম।
আজ কিছুদিন হইল আয়নাল আবেদীন খুবই পীড়িত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মুখে কিছুই রোচে না। নানা পদের ওষুধের প্রভাবে খাদ্যের স্বাদ বিস্বাদ ঠেকিতেছে। একবার বলেন, খিচুড়ি খাইবেন। লায়লা বেগম খিচুড়ি রন্ধন করিয়া লইয়া যান। খাইতে বসিয়া আয়নাল আবেদীন বলেন, খিচুড়ির ডাইল শক্ত লাগে ক্যা? তিনি ঘোটা করিয়া ঝাল খিচুড়ি খাইতে চান। লায়লা বেগম আবার ঘোটা করিয়া ঝাল খিচুড়ি করেন। তখন আয়নাল আবেদীন বলেন তাঁর খেজুর খাইতে ইচ্ছা করিতেছে।
লায়লা বেগম বাজারে গিয়া খেজুর কিনিয়া আনেন। স্বামীকে বলেন, এই নাও খেজুর। কয়টা ধুয়ে দিব?
আয়নাল আবেদীন কহেন, সাত-আটটা খেজুর ধুয়ে দাও।
লায়লা বেগম সাত-আটটা খেজুর ধুইয়া তাঁহার সম্মুখে রাখেন। আয়নাল আবেদীন দুইটি খাইয়া আর খাইতে পারেন না।
এই যখন অবস্থা, লায়লা বেগম হাসপাতাল ও বাসা আপ-ডাউন করেন। কখনো ওষুধ আনেন, কখনো পানি গরম করেন, কখনো পাতলা ভাত, স্যুপ, কখনো ডাল, কখনো ফল। পোটলা করিয়া লইয়া যান, আবার ফিরিয়া আসেন। সংসারের যে কাজগুলি সুস্থ মানুষের চোখে কাজ বলিয়া প্রতীয়মান হয় না, হাসপাতালে অসুস্থতার কালে তাহাই পাহাড় হইয়া দাঁড়ায়। এক বাটি ভাত, এক চামচ ডাল, একখানি তোয়ালে, এক বোতল পানি, মোবাইলের চার্জার, টুথব্রাশ এইসব বস্তুই তখন এক একটি অভিযানের মতোন ঠেকে।
তা, একবেলা আয়নাল আবেদীন কহিলেন তাহার পুঁইশাক দিয়া ঝাল করিয়া ডাল খাইতে বড় ইচ্ছা করিতেছে।
লায়লা বেগম মনে মনে ঠিক করিলেন, সুন্দরবন কুরিয়ার হইতে বেয়াইবাড়ির একটি পার্সেল আসিয়াছে, সকালে নোটিশ পাইয়াছেন। প্রথমে সেই পার্সেলখানা তুলিয়া বাড়িতে রাখিবেন, তারপর বাজারে যাইয়া পুঁইশাক কিনিবেন। এই রৌদ্রে বাজারে যাওয়া সহজ নহে, কিন্তু অসুস্থ স্বামীর ছোটখাটো এইটা ওইটা খাইতে চাওয়া লায়লা বেগমের নিকট একপ্রকার ধর্মকর্মের মতোই মনে হয়।
বেয়াইবাড়ির পার্সেলের কথা যখন উঠিল, সেই প্রসঙ্গে একটু বলিয়া রাখি। বঙ্গদেশের সমাজরীতি অনুযায়ী আমার মনে হয় কন্যার শ্বশুরালয় হইতে প্রতি বছর নানা ফল-ফসল, মরিচ-পেঁয়াজ, আম-জাম, শাক-সবজি কন্যার পিত্রালয়ে পাঠানো- ইহা খুব প্রচলিত রেওয়াজ নহে। অনেক জায়গায় বরঞ্চ উল্টো হিসাব। কন্যার বাপের বাড়ি কী পাঠাইল, কত পাঠাইল, সময়মতো পাঠাইল কি না- এইসব লইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামাজিক দাঁড়িপাল্লা হাতে অনেকেই বসিয়া থাকে। কিন্তু এই বাড়ির কন্যার শ্বশুরালয়ের লোকগুলি অন্য রকম।
প্রশ্ন হইতে পারে, কী রকম?
বলিতেছি।
এই যে কাচারি বাজার ঘেঁষা রংপুরের বাড়িখানার কথা বলিতেছি, সেই বাড়ির এক কন্যার বিবাহ হইয়াছে যশোর-ঝিনাইদহ অঞ্চলে। কন্যাটি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িত। একবার একটি দুর্বল বিড়ালছানা আসিয়া ভিড়িল তাহার নিকট। কন্যাটি পাউডার দুধ গুলাইয়া তুলায় ভিজাইয়া ছানাটিকে খাওয়াইত, গরম কাপড়ে মুড়িয়া রাখিত, চোখ-মুখ পরিষ্কার করিত।
এই পরিবারের পতিত-বিড়াল প্রাপ্তির ভাগ্য রহিয়াছে। সেই ধারাবাহিকতা অনুসারে ইহা সম্ভবত পঞ্চম কি ষষ্ঠ নম্বর বিড়ালছানা। ছানাটি আর কোথাও যায় না। কন্যাটির সহিত আটিয়া বসিয়া থাকে। কন্যাটি ক্লাস হইতে ফিরিয়া দেখে, ছানাটি ক্ষুধিত, দরজার কাছে বসিয়া যেন তাহারই অপেক্ষায় রহিয়াছে। ফিরিলেই ঝাঁপ দিয়া তাহার কাছে আসে, কোলে ঢুকিয়া পড়ে, এবং সেইরকমভাবে মুখের দিকে চাহিয়া থাকে, যেইরকমভাবে কেবল অবলা প্রাণীরাই মানুষের পানে চাহিতে পারে। কিন্তু নিয়মিত পরিচর্যা ক্রমে কঠিন হইয়া উঠিল। একে বাড়ি হইতে দূরে, তার উপর ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনা, মেসের নিয়ম, সব মিলাইয়া বিড়ালছানাটি যেন একসঙ্গে মায়া ও বিপদ হইয়া দাঁড়াইল। অন্য মেয়েদের বিষয়টি ভালো না লাগিতে পারে, বাড়িওয়ালা উপদ্রব বলিয়া মনে করিতে পারেন। অথচ ছানাটিকে সে কোনওভাবেই রাস্তার উপর ফেলিয়া আসিতে পারিবে না।
অতঃপর কন্যাটি তাহার প্রণয়-সহচরের সহিত বিষয়টি আলোচনা করিল।
যুবকটি রাজশাহী হইতে ছানাটিকে লইয়া তাহাদের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে গেল। ছেলেটির পিতা-মাতা ছানাটিকে অতি আদরে বরণ করিলেন এবং পরম যত্নে পালন করিতে লাগিলেন। কিছু বছর পরে ছেলেটি উক্ত কন্যাটিকে বিবাহ করিয়া বিদেশে পাড়ি জমাইল। তখন পিতা-মাতা বিড়ালছানাটিকে একমাত্র পুত্র ও পুত্রবধূর একটি আদুরে তুলতুলে স্মৃতি বলিয়া আরও অধিক আদরে, আরও অধিক যত্নে পালন করিতে লাগিলেন।
কথিত আছে, শ্বশুরমশাই বাজার হইতে বিড়ালটির জন্য বোয়াল মাছ কিনিয়া আনিতেন। শাশুড়ি নাকি মজা করিয়া সেই বোয়াল মাছ রান্না করিয়া দিতেন বিড়ালটিকে। এইভাবে আদরে-যত্নে ছানাটি কৈশোর, যৌবন অতিক্রম করিল। একসময় রোগশোক হইয়া সকলকে কাঁদাইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। কথিত আছে, আজও সেই বাড়ির লোকজন তাহার কথা মনে করিয়া কাঁদিয়া থাকে।
এই সেই ঝিনাইদহের বেয়াইবাড়ি, যাহা হইতে বছরের বিভিন্ন সময়ে হুটহাট কুরিয়ারযোগে কিছু না কিছু আসিয়াই থাকে। মৌসুমি ফল, আবাদী আরও নানা-প্রকার জিনিস ইত্যাদি। লায়লা বেগম মাঝে মাঝে ভাবেন, আহা, তাঁহারা এমন করিয়া পাঠান!
যতটুকু পারেন, লায়লাও চেষ্টা করেন।
যাহা হউক, ঝিনাইদহের বেয়াইবাড়ির পার্সেলখানা বহন করিতে করিতে লায়লা বেগম যখন গৃহে প্রবেশ করিবেন, তখন তাঁহার ফোনখানা বাজিয়া উঠিল। তিনি কোনোমতে ঘরে ঢুকিয়া পার্সেল নামাইয়া ফোন ধরিলেন।
আমি বলিলাম, মা, বাপীর কেবিন নম্বর এত না?
লায়লা বেগম বলিলেন, না, এত না, অত। কেন বল তো?
আমি বলিলাম, সোহেল জানতে চাচ্ছে।
লায়লা বেগম বলিলেন, ও সোহেল! কেন, ও কি রংপুরে?
আমি বলিলাম, আগে লালমনিরহাটে ছিল। এখন নাকি রংপুরে পোস্টিং।
লায়লা বেগম বলিলেন, ও আচ্ছা। কেন, ও কি ক্লিনিকে আসবে?
আমি বলিলাম, মনে হয়। রংপুরে যেহেতু, হয়তো সময় করে যাবে।
এইসব বলিতে বলিতে লায়লা বেগম পার্সেল আসিবার কথা আমাকে জানাইলেন এবং পার্সেলখানা খুলিতে লাগিলেন। খুলিয়াই দেখিলেন, বড় বড় ডাসা ডাসা পুঁইলতা শাক, আম, সেই সঙ্গে আরও নানা ফল-ফসল। আয়নাল আবেদীনের যে পুঁইশাক খাইতে ইচ্ছা হইয়াছিল, আর লায়লা বেগম যে ভাবিয়াছিলেন পার্সেল ঘরে রাখিয়াই এই খর রৌদ্রে বাজারে ছুটিবেন, সেই পুঁইশাকই একেবারে পার্সেল ভর্তি হইয়া ঝিনাইদহ হইতে আসিয়া পড়িল।
ইহা দেখিয়া লায়লা বেগম আত্মস্বরে আহ্লাদিত হইয়া উঠিলেন।
তিনি দ্রব্যাদি বাহির করিতে করিতে বলিলেন, এখন আমি তাহলে একটু পুঁইশাক রান্না করে তোর বাপের জন্য নিয়ে যাব, আর বলব- সারপ্রাইজ!
তারপর বলিলেন, আর শোন, সোহেল আসলে একবার কল দিয়ে আসতে বলিস। আমি বাসা-ক্লিনিক আপ-ডাউন করতেছি। ও ক্লিনিকে গেলে যদি তখন আমি না থাকি, খারাপ লাগবে। ওর সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। আমি যখন ওখানে থাকব, তখন যদি আসে তো ভালো হয়।
প্রায় তেইশ-চব্বিশ বছর আগে, আমি যখন এগ্রি ভার্সিটিতে পড়ি, তখন আমরা কয়েকজন ছেলে-মেয়ে রংপুর হইতে ময়মনসিংহে একত্রে যাতায়াত করিতাম। সোহেল আমাদেরই ক্লাসের বন্ধু। সে অনেকসময়ই আমাদের টিকেটের বিষয়টা খেয়াল রাখিত। শুধু কি তাই? ময়মনসিংহ স্টেশনে ট্রেন থামিবার আগে আগে দরজার কাছে কিছু লোক জটলা করিয়া থাকিত। উদ্দেশ্য পকেটমারা, ধাক্কাধাক্কি, এবং মেয়েদের গায়ের এখানে-ওখানে হাত রাখা। সোহেল এবং আমাদের সাথের ছেলে বন্ধুরা তখন হিউম্যান চেইনের মতো বৃত্ত করিয়া মেয়েদিগকে সেই বৃত্তের ভিতর লইয়া ট্রেন হইতে নামাইয়া নিত।
একবার হইল কি, দরজার কাছে বাজে লোকদের বিশেষ বড় জটলা। সোহেলসহ বন্ধুরা সিদ্ধান্ত দিল, শোন, জানলা দিয়ে নামতে হবে।
আমি আকাশ হইতে পড়িলাম।
জানলা দিয়ে নামব মানে?
আমি মাঠবিমুখ মানুষ। জীবনে একটা পূর্ণাঙ্গ দৌড়ও দেই নাই। ট্রেনের জানালা দিয়া নামা আমার নিকট মঙ্গলগ্রহ হইতে মহাশূন্যে ঝাঁপ দেওয়ার মতো ব্যাপার। আমি বলিলাম, কোনোভাবেই আমি জানলা দিয়ে নামব না। আমি দরজা দিয়েই নামব।
বন্ধুরা বলিল, পাগল নাকি? ওদের মধ্যে দিয়ে কোনোভাবেই নামা যাবে না, আর কিছু না হলেও, এ্যাতো ভীড় যে আমরা নামার আগেই ট্রেন ছেড়ে দেবে।
ততক্ষণে ট্রেন থামিয়া গিয়াছে। দুই মিনিটের মধ্যেই ছাড়িয়া দিবে। চিন্তা করিবার সময় নাই।
নাম! তোরা নাম! তাড়াতাড়ি নাম! সোহেলরা তারস্বরে চেঁচাইয়া উঠিল।
আমরা তাকাইয়া দেখি, আমাদের এক বান্ধবী, যে গান গায়, নাচে, গাছে চড়ে, পুকুরে নামে, সে আমাদের সকলের চোখের সামনে দিয়া চকিতে অতি দক্ষতায় ট্রেনের জানালা গলিয়া নামিয়া গেল। আমার মনে হইল, মানবজাতির বিবর্তনের ইতিহাসে ট্রেনের জানালা-প্রস্থান হয়তো এক অতি প্রাচীন স্বাভাবিক দক্ষতা, এবং আমিই কেবল সেই দক্ষতা লাভে বঞ্চিত হইয়াছি।
সোহেলসহ আরও দুই-চারজন বন্ধু আমাদের বান্ধবীটিকে অনুসরণ করিয়া ঝটিকা গতিতে জানালা-প্রস্থান করিল। কামরার ভিতরের উপস্থিত জনতা ততক্ষণে উহাদের সকলকে উৎসাহ প্রদান করিতে শুরু করিয়াছে। বাকি রহিলাম কেবল আমি। নবযৌবনরত তরুণ-তরুণী দলের একমাত্র অপদার্থ সদস্য হিসেবে আমি জানালার সম্মুখে আটকা পড়িয়া কি করা যায় ভাবিতে লাগিলাম।
বাহির হইতে আমার বন্ধুগণ তারস্বরে আমার নাম ধরিয়া চেঁচাইতেছে। কামরার ভেতর হইতে এক সহৃদয় ভাই আমাকে জানালা দিয়া মাথা গলাইতে উদ্যত হইতে দেখিয়া বলিলেন, আপা, পা আগে বাইর করেন, তারপর মাথা।
আমি তড়িতে কোনোমতে “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি” করিতে করিতে পা নামক অঙ্গদ্বয়ের মধ্যে ডান পা-টিকে শৈল্পিকভাবে বাহির করিলাম, তারপর ডানহাত সহ মাথা এবং বাকি শরীর নামক বৃহত্তর প্রশাসনিক অঞ্চল জানলা দিয়া বাহির করিয়া প্ল্যাটফর্মে কোনমতে স্থান নিব নিব এই অবস্থায় ট্রেনখানি ধীরলয়ে চলিতে শুরু করিল এবং আমার বামপায়ের জুতোসহ বাম পা-খানি জানালার মধ্যে কেমন করিয়া জানি আটকাইয়া থাকিল।
উপস্থিত জনতা- বাহিরে যাহারা ছিল, তাহারা যেমন আমার ভবিষ্যৎ লইয়া উদ্বিগ্ন হইল, কামরার ভিতরের লোকজনও তেমনই অস্থির হইয়া উঠিল। কেহ বলিল, ধরেন ধরেন! আস্তে! কেহ বলিল, ওরে বাবারে! কেহ আল্লাহ খোদাকে ডাকিতে লাগিল। আমার আটকা পড়া বামপায়ের জুতো, কামরার ভিতর হইতে সেই সহৃদয় ভাই যিনি আমাকে পা আগে, মাথা পরে বাহির করিতে বলিয়াছিলেন, তিনি কোনোমতে ছাড়াইয়া দিলেন। আমি ধীরলয়ে-চলন্ত ট্রেন হইতে অবমুক্ত হইয়া প্ল্যাটফর্মে আমার বন্ধুদের ঘিরিয়া ধরা সমাবেশস্থলে অ-গুরুতর অবস্থায় দড়াম করিয়া পড়িলাম।
টাল সামলাইয়া দাঁড়াইয়া আমি সোহেলকে বলিলাম, এই দেশটার কী হবে রে?
সেই কথা সোহেল যতবার আমাকে দেখিত, ততবার মনে করাইয়া দিত। তারপর হাসিতে ফাটিয়া পড়িত।
সোহেলের সহিত শেষ দেখা হইয়াছিল প্রায় দশ বছর আগে, কিংবা তাহারও অধিক। মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। আসলে প্রবাসজীবন মানুষকে এমনভাবে দূরদেশ, সংসার, বারো ভেজাল ও সময়ের ব্যবধানের ভিতরে টুকরো করিয়া রাখে যে, এককালের নিত্যকার বন্ধুরা ক্রমে উৎসব, বিপদ-আপদ, প্রয়োজন, অথবা হঠাৎ মনে পড়িবার মানুষে পরিণত হয়। যোগাযোগ কমে, কথাবার্তা বিরল হইয়া ওঠে। তবে সখ্যের ভিতরের আসল সুরটি কোথাও কখনোই নিভিয়া যায় না।
গতকাল উহাকে ফোন করিয়াছিলাম এক বিশেষ প্রয়োজনে। স্থানীয় এক লোক মারফত খবর পাইয়াছিলাম, অমুক ইউনিয়নের জবাগাছ নামক গ্রামে, মরহুম অমুক মণ্ডলের নেশাগ্রস্ত পুত্র তমুক তাহার বধূটিকে মারিয়া ধরিয়া ফেলিয়া রাখিয়াছে। বধূটির বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন। তাহার ফেসবুকও নাই, যোগাযোগের উপায়ও নাই, সে অতি দরিদ্র, অতি অসহায়। তা, না পারে কারুকে জানাইতে, না পারে নিজে কোথাও পলাইয়া যাইতে। তাহার পাশের বাড়ির একটি লোকমুখে এই সংবাদ পাইয়াছিলাম। সেও বেশি জড়িত হইতে চাইতেছিল না, পাছে নেশাখোর লোকটি তাহার কোনও ক্ষতি করিয়া বসে।
ওয়েবসাইট হইতে নম্বর লইয়া আমি বাংলাদেশ সময় সকাল দশটার দিকে উক্ত ইউনিয়নের ইউএনও অফিসের ল্যান্ডলাইন ও মোবাইল ফোনে কল করিলাম। কল করিলাম বলিলে ভুল বলা হয় বুঝিতে পারিলাম; কল শুরু করিলাম বলা ভালো। বহুবার করিলাম, মিনিটে মিনিটে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় করিলাম, কেহ ধরিল না। অতঃপর আরেকজন পরামর্শ দিলেন, সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরকে জানাইতে হইবে, তাহারা যেন বধূটিকে উদ্ধার করিয়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। অতঃপর সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের উক্ত উপজেলার ল্যান্ডলাইন ও মোবাইল নম্বর খুঁজিয়া বাহির করিলাম। আবার কল করা শুরু করিলাম। প্রথমে মিনিটে মিনিটে, পরে ক্লান্ত হইয়া ঘণ্টায় ঘণ্টায়। কেহ ধরিল না। শেষে মোবাইল নম্বরখানা বন্ধ পাওয়া গেল।
আমি ক্লান্ত হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, কী করা যায়। ফেসবুকে খুঁজিলাম, উক্ত জেলার কোনো মেয়েদের গ্রুপ বা নারী সহায়তা-সংক্রান্ত পেইজ পাওয়া যায় কি না। পাইলাম বটে, কিন্তু বুঝিলাম, তাহাদের অধিকাংশ পেইজ নানা পণ্যসামগ্রী, শাড়ি, গহনা, প্রসাধনী, আর অনলাইন কেনাবেচার দেনদরবারে পরিপূর্ণ। এক অসহায় দরিদ্র বধূ কোথায় নেশাগ্রস্ত স্বামীর মার খাইয়া পড়িয়া আছে, সে বিষয়ে তাহারা কতদূর কী করিতে পারিবে সন্দেহ হইল। মাঝখান হইতে ভুল জায়গায় ভুল সময়ে উদয় হইবার অপরাধে আমাকেই ভাইরাল করিয়া দিতে পারে, এই ভয়ে সেইসব পেইজ হইতে সরিয়া আসিলাম।
ভাবিতেছিলাম, কী করা যায়। এমন সময় মনে পড়িল, আমার বন্ধু সোহেল ওই অঞ্চলে এক সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত আছে। উহাকে একবার বলিয়া দেখি।
তখনই জানিতে পারিলাম, বন্ধু সোহেল বদলি হইয়া রংপুরে অবস্থান লইয়াছে। সরাসরি তাৎক্ষণিক কিছু করিতে পারিল না, কিন্তু নাম-ঠিকানা লইয়া রাখিল। বলিল, তাহার কন্টাক্ট মারফত খবর লইবার চেষ্টা করিবে।
এইসব কথা থাক। গল্পের যে ডালপালা ছড়াইয়া পড়িল, তাহা গুটাইয়া লইয়া আবার সেই জায়গাতেই ফিরি, যেখানে কথাটি থামিয়া গিয়াছিল। লায়লা বেগমের পার্সেল। লায়লা বেগম পার্সেল হইতে শাকলতা, পেঁয়াজ, ঢেঁড়স, আম, কাঁচামরিচ ইত্যাদি বাহির করিলেন। পুঁইশাক ধুইলেন, ডাল বসাইলেন, রসুন কুটিলেন, কাঁচামরিচ ছিঁড়িলেন। চুলার উপর হাঁড়ি চাপাইয়া দিলেন। পুঁইশাকের সঙ্গে ডাল, বেশি করিয়া ঝাল, একটু পেঁয়াজ-রসুন, একটু সরিষার তেল দিয়া অল্প আঁচে চুলায় বসাইলেন।
এদিকে জোহরের ওয়াক্ত পার হইয়া যায়। তিনি ভাবিলেন, আগে নামাজটা আদায় করিয়া লই। নামাজ পড়িলেন। তারপর ভাত বাড়িলেন, পুঁইশাকের তরকারি নামাইয়া একটি লাঞ্চবক্সে ভরিলেন, পানির বোতল ভরিলেন, চামচ নিলেন কি নিলেন না তা দেখিলেন, আয়নাল আবেদীনের প্রয়োজন হইতে পারে এমন দুই-একটি জিনিস ব্যাগে ঢুকাইলেন। গরম ভাত, পুঁইশাক-ডাল, একটু লেবু, সামান্য ভর্তা, আর এক বোতল পানি- সব গুছাইয়া রওনা দিলেন ক্লিনিকের দিকে।
ক্লিনিকে পৌঁছাইয়া দেখিলেন, আয়নাল আবেদীন দুপুরের খাবারের জন্য লায়লার অপেক্ষায় বসিয়া আছেন।
লায়লা বেগম মুখে আনন্দ লইয়া বলিলেন, শোনো, ঝিনাইদহ থেকে বেয়াই পাঠাইছেন, কী বলতো?
আয়নাল আবেদীন বলিলেন, কী?
তুমি সকালেই সেই খাবারের কথা বলছিলা, এই দ্যাখো- সারপ্রাইজ!
বলিতে বলিতে লায়লা বেগম ব্যাগ খুলিলেন। পানির বোতল বাহির করিলেন। তারপর গামছা। তারপর ওষুধ। তারপর লেবু। একটি পলিথিনে কয়টি চামচ। ব্যাগের আরও ভিতরে হাত ঢুকাইলেন। ডান দিক, বাঁ দিক, নিচের দিক, তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলেন। পুঁই শাকের বাক্সখানা নাই।
এইবার তাঁহার বোধোদয় হইল- শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় পুঁইশাকের বক্সটাই ব্যাগে তোলা হয় নাই।
আয়নাল আবেদীন চাহিয়া আছেন। লায়লা বেগমও চাহিয়া আছেন। সারপ্রাইজড্ হইবার কথা ছিল, হইল বটে।
লায়লা বেগম কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া কহিলেন, আহা রে! পুঁইশাকটা তো মনে হয় বাসায়ই রেখে আসছি।
আয়নাল আবেদীন বলিলেন, থাক, আর যাইও না। এত দৌড়াদৌড়ির দরকার নাই। তবু লায়লা বেগম আবার সেই তপ্ত রোদের ভিতর বাহির হইয়া পুঁইশাকের বাক্সখানা আনিতে ছুটিলেন। ফিরিয়া আসিয়া, দুইজনে মিলিয়া ক্লিনিকের কেবিনে, মধ্যাহ্নের আহার সমাপ্ত করিলেন। সারাদিন বহুত হুড়োহুড়ি। ক্লান্ত মনে লায়লা বেগম কেবিনে বাড়তি বিছানায় সামান্য জিরাইতে গেলেন। ঘুমের মধ্যে অবচেতনে তাহার মনে হইল কয়েকদিন হয় আয়নাল আবেদীনকে কমলা খাইতে দেওয়া হয় নাই, সন্ধ্যাবেলা তিনি কমলা কিনিয়া আনিবেন।
সন্ধ্যাবেলা ডাক্তার আসিলেন। কিছু কথাবার্তা হইল, ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট দেখিলেন, পরবর্তী করণীয় কী, তাহা লইয়া আলোচনা চলিল। এইসবের মধ্যে কমলা কেনার কথাটি লায়লা বেগমের মন হইতে ফসকাইয়া গেল। সন্ধ্যা পার হইয়া রাত্রি আসিল। তিনি বারবার ভাবিতে লাগিলেন, কী যেন একটা করিবার কথা ছিল, কী যেন একটা করিবার কথা ছিল, কিন্তু ঠিক ধরিতে পারিলেন না। যাহা হউক, এমন সময় কেবিনের দরজায় সোহেল উদয় হইল।
লায়লা বেগম সোহেলকে দেখিয়া আহ্লাদিত হইয়া উঠিলেন। এতদিন পরে দেখা। সোহেল সালাম দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। কুশল জিজ্ঞাসা করিল। তারপর ডানহাতে ধরা ব্যাগখানা আগাইয়া দিয়া বলিল, খালা, এটা খালুর জন্য। কমলা আনছি।
ইহাকেও কি কেবল কাকতাল বলা যায়?
হয়তো যায়।
হয়তো যায় না।
(৬ই আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)